১৬ সেপ্টেম্বর:
আজকে রাতেই আমাদের ফিরতি ফ্লাইট। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্ল্যান করতে লাগলাম কেমনে কী করা যায়।আমি আর রিফতি সকালে ওয়ালমার্টে শেষবারের মতোন গেলাম দেশে চকলেট নিয়ে ফিরতে। প্রায় ৩০ ইউএসডির মতোন চকলেট নিলাম। পরে কয়েকবার ইলেক্ট্রনিক জিনিস পত্র ঘুরে ফিরে দেখলাম কী কেনা যায়।কিছু না পেয়ে শুধু চকলেট নিয়েই ফিরলাম বাসায়। এবার ক্যাব কল করে দিয়েছিলো ওয়ালমার্টের মালিক। ক্যাব ড্রাইভার খুবই রগচটে আর বিরক্তিকর ছিলো।
এরপরে বাসায় ব্যাক করলে আসিফ রা প্ল্যান করেছে আলাস্কা জ্যু তে যাবে। এজন্য পরে কীভাবে ক্যাব ঠিক ঠাক করবে এটা ভাবতে ভাবতে দিদার ভাইকে কেউ একজন ফোন দিল। দিদার ভাই আমাদের জন্য আকজন বাঙালি ক্যাব ড্রাইভার ঠিক করে দিলেন।এটা যে কী লেভেল এর ব্লেসিং ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করার মতোন না। রানটাইমে আমাদের প্ল্যান হুট করে Whittier এ চেঞ্জ হলো। ক্যাব এ মানুষ আটবে মাত্র ৬ জন। কীভাবে নাহিয়ান লাবিবাকে জানাবে এটা ভাবতে ভাবতে নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গেলাম আমরা আর ইইই এর তিনজন ভয় পেতে লাগলো কীভাবে এই ট্যুরের কথা ওদের দুইজনকে জানাবে!
ড্রাইভার আংকেল আমাদের কে অনেক ভাবে আপ্যায়ন করলেন। একটা জায়গায় থামিয়ে আমাদের জন্য কফি,চিপস, খেজুর এর ব্যবস্থা করলেন। মেহেরপুরের মানুষ উনি। প্রায় ২৮ বছর হলো এংকোরেজে এসেছেন। রাস্তায় আমাদের অনেক কিছু দেখাতে দেখাতে যেতে লাগলেন।উনার ফ্যামিলির কথা বলতে লাগলেন। বুঝতে পাএলাম দূর পরবাসে অকস্মাৎ বাঙালির দেখা পেলে আসলে কত খুশি আর স্বত:স্ফূর্ত হয়ে উঠে সবাই।
হুইটিয়ারে যাওয়ার পথের রাস্তার ভিউ পুরা নৈসর্গিক। সাগর আর পাহাড়ের মিলনমেলা।উপরে কালো মেঘ।লং ড্রাইভে কিছুক্ষণ পরে রংধনু দেখা গেলো।গাড়ি চলার সময় চারপাশ থেকে চোখ সরানো যাচ্ছিলো না। সময়ের সাথে আমরা হুইটিয়ার টানেলের দিকে পৌছলাম। এই টানেল টা বেসিকালি রেল পথের জন্য বানানো।হুইটিয়ারে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জিনিস পাতি ক্যারি করা হয়। একটা স্পেসিফিক টাইমের জন্য সেটা গাড়ির জন্য উন্মুক্ত করা হিয়।টানেলের দৈর্ঘ্য ও বেশ বড়।টানেল শেষে হুইটিয়ার এন্ড পয়েন্টে আসলাম। শুরুতে দেখে একেবারেই সাদামাটা মনে হচ্ছিল।কিন্তু একটু সামনের পয়েন্টে পৌছাতেই আসল সৌন্দর্য ধরা দিল। নিচে অনেক গুলো ছোটখাতো বোট সারি বেধে আছে। আর কয়েকটা পোর্ট স্টেশন। চারদিকে নীলাভ আবহাওয়া। একটানা বৃষ্টি পড়ছিলো।বৃষ্টির মাঝে খুব দ্রুত নেমে আমরা অনেক গুলা ছবি তুললাম আর গাড়িতে উঠে বসলাম।
হুইটিয়ারে যাওয়ার লং ড্রাইভ লেন
হুইটিয়ার এন্ড পয়েন্ট
আংকেলকে বললাম আমরা গ্লেসিয়ার দেখতে চাই।হুইটিয়ার এন্ড পয়েন্টে তেমন কাছাকাছি গ্লেসিয়ার পাওয়া যায় না। এর জন্য পোর্টেজ গ্লেসিয়ার পয়েন্টে যাওয়া লাগবে।তাই আমরা ফিরতি পথে রওনা দিলাম।ওখানে পথিমধ্যে পোর্টেজ গ্লেসিয়ার পড়বে। পোর্টেজ গ্লেসিয়ারে পৌছানো শেষে আমাদের আংকেল একটা পোলার বেয়ার স্প্রে হাতে ধরিয়ে দিল,আর বললো সামনে থেকে কাছাকাছি গ্লেসিয়ার দেখে আসতে। যাওয়ার রাস্তা টা একদমই নীরব। আশপাশে ভাল্লুক আক্রমণের সম্ভাবনা আছে।এই ভয়ে আসিফের কলিজা একেবারেই শুকিয়ে গেলো।ও আর সামনে এগোতেই চাচ্ছিলো না। পোলার বেয়ারের স্প্রে আছে এটা দেখার পরেও শেষমেষ অবধি যেতে পারলাম না পোলাপানের জন্য। শেষে শাহরিয়ার মুখ দিয়ে একটা ভাল্লুকের মতোন শব্দ করা শেষে যে আসিফ সুদীপ্ত দৌড় দিয়ে সামনে পালাচ্ছিল এই দৃশ্য চিন্তা করলে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার উপক্রম হবে সবার।
পোর্টেজ গ্লেসিয়ারে যাওয়ার পথে
যাই হোক, পোর্টেজ গ্লেসিয়ারের দূর থেকে আমরা কিছু গ্লেসিয়ার দেখতে পেয়েছিলাম।ওখানে ব্লু আইস এর ও দেখা পাই। ব্লু আইস মূলত যেসব বরফ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গলে যায় না সেগুলাকে বুঝায়।উত্তর মেরুর কাছাকাছি এসে এগুলো দেখে অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছিলো।
পোর্টেজ গ্লেসিয়ার শেষে ড্রাইভার আংকেল একটা স্কি করার রিসোর্টে নিয়ে গেলেন। ওখানে এন্ট্রি ফ্রি পার পার্সোন ৪৫ ইউ এস ডি,যেটা অনেক বেশি মনে হয়েছে। আর এই সামার টাইমে স্কি করার সুযোগ নেই,শুধু ক্যাবল কার এ উঠা যাইতো। তো এটা বাজেটে ম্যাচ না করায় আমরা চললাম আলাস্কা জু এর দিকে।
পোর্টেজ গ্লেসিয়ার থেকে পালানোর আগে
আমরা কতক চিড়িয়া গেলাম চিড়িয়াখানায়।জ্যু তে এন্ট্রু ফি ২৫ ইউএসডি। জ্যু তে হরেক রকমের বিচিত্র প্রাণি। নর্থ পোলের দিকে মোটামুটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল পোলার বেয়ার। পোর্টেজ গ্লেসিয়ারের দিকে পোলার বেয়ার দেখার ভয় উশুল করলাম।জ্যু তে এক বাচ্চা পোলার বেয়ার একটানাই একটা ড্রামের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে আনা নেওয়া করতে লাগলো৷ আর এই ভয়ানক ঠান্ডা পানির মধ্যে সাঁতার কাটছিলো।দেখতে কিউট কিন্তু বিশালদেহী।একবার মানুষকে পেলে যে এক চেষ্টায়ই মেরে ফেলতে পারবে শরীর দেখেই বুঝতে পারলাম। আগে পোর্টেজ গ্লেসিয়ারে নাকি ২-৩ জন ট্যুরিস্ট এর খালি হাড়গোড় পাওয়া গেছে শুনলাম ড্রাইভার আংকেলের কাছে।তো অন্য প্রাণিগুলোকে এক পলক দেখেই দ্রুত গাড়িতে উঠে বসলাম।রওনা দিলাম বাসার উদ্দেশ্যে।
স্কি রিসোর্ট এর সামনে
শেষমেষ আলাস্কা জ্যু তে পোলার বেয়ার
বেবি পোলার বেয়ার
সব চিড়িয়া যখন চিড়িয়াখানায়
বাসায় বিকালের দিকে দিদার ভাই আসবে। আমরা দ্রুত পুরো বাসা গুছিয়ে রাখলাম।দিদার ভাই আমাদের সবার জন্য খাবারের বিশাল আয়োজন নিয়ে আসলেন। তেহারি, লবস্টার কারি,বিফ কারি আরও কী কী ছিল মনেও পড়ছে না। মোটামুটি সবাই এতদিন পরে বাঙালি খাবারের স্বাদ পেয়ে পুরোটা মুহূর্তের মাঝেই সাবাড় করে ফেললো।মোটামুটি ৫ দিন পরে বাঙালি খাবার পেলাম আমরা!
ALL IN ONE
যে ছয়জনের অত্যাচার পিছনের বাড়ি টি সহ্য করেছে
লাবিবা আর নাহিয়ান In the meantime আমরা যখন বাইরে ছিলাম তখন আমাদের বাসায় ওদের স্যুটকেস রেখে Anchorage University তে মাসুম ভাইয়া আর ভাবীর সাথে উনাদের গাড়িতে করে ঘুরতে গিয়েছিল।মাসুম ভাইয়া বুয়েট ১৬ ব্যাচ, উনি আমাদের খোজ পেয়েছে গতকালই যে আমরা এখানে আছি! ওদেরকে উনারা আবার আমাদের বাসায় নামিয়ে দিলো।আমরা সবাই নিচে নেমে ভাইয়ার সাথে দেখা করলাম। মাসুম ভাইয়া আমাদের সবার জন্য বিশায়াল পিৎজা নিয়ে আসে।আমরা একটু আগেই অনেক টুকু খাবার খেয়ে ফেলায় পিৎজা পুরোটা খেতে পারলাম না।লাবিবা নাহিয়ান ও দিদার ভাইয়ার খাবার খেল বাসায় এসে।
এবার ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে আমরা রওনা হওয়ার পালা। আচমকাই বাসাটার জন্য খারাপ লাগছিলো।মোটামুটি ৪ দিন নিজেরা একটা ছোটখাটো সংসার তৈরি করে ফেলেছিলাম।আমার মতোন মানুষ যে কি না কিচেনের ধারেকাছেও যায়নি কখনও সে কি না প্রতিদিন ডিম ভেজে নিজের জন্য খাবার বানিয়েছে! ৬ জন সবাই একটা মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং এ চলছিলাম। বাসার কাউচে ঘুমানোর জন্য আশিক, শাহরিয়ার, রিফতির প্রতিযোগিতা ছিল চোখে পড়ার মতোন। যাই হোক,সব কিছুরই একটা এন্ডিং থাকে। শেষমেষ দিদার ভাই আর আরেকজন বাঙালি আমাদের আলাস্কা এয়ারপোর্টে উনাদের গাড়ি দিয়ে পৌছে দিলো। উনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা বলে শেষ করা যাবে না।
সিক্যুরিটি চেকিং আর বোর্ডিং শেষে এলাস্কা বোয়িং এ আমরা ফিরতি পথে যাত্রা শুরু করলাম বাংলাদেশের পথে!

















No comments:
Post a Comment