১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
এংকোরেজে পৌঁছে নতুন বাসায় ঢুকে সাথে সাথেই নিত্য নতুন সরঞ্জামের সাথে পরিচিত হলাম। অনেক কাজকারবার করে ডিহিউমিডিফায়ার আর হিটার অন করলাম। ইইই এর ৩ টা এক রুমে আর আমরা সিএসই এর ৩ টা অন্য রুমে আসলাম।যে এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছিলাম,সেটায় ছিল ২ বেড,এক ডাইনিং ড্রয়িং আর কিচেন। ওয়াশরুম ছিল মোটে একটা।
মার্কিন মুলুকে শুরুতেই প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় এই ওয়াশরুম। কোনো পুশ নেই বা ফ্লোর দিয়ে পানি পাস হওয়ার জায়গা নেই।বাঙালি সবার জন্য এটা পুরোপুরিই অনভিপ্রেত।আমরা অনেক চিন্তা ভাবনা করে ভেজা টিশ্যু বা বোতল দিয়ে 'কার্য সম্পাদন' করার পদ্ধতি বের করলাম!
আমি হালকা ফ্রেশ হয়ে আসলাম ওয়াশরুম থেকে।ওয়াশ রুমের বাকি জিনিস বেশ চমকপ্রদ। দুই দিকে দুইটা টিউনার দিয়ে গরম পানি ঠান্ডা পানি ফ্লো কন্ট্রোল করা যায় ইচ্ছামতোন। আর বাথটাবেও হট কোল্ড ওয়াটারের সিস্টেম।কিন্তু সর্বোপরি বাঙালিদের জন্য একটা প্রথম চ্যালেঞ্জের নাম এই ওয়াশরুম! ফ্রেশ হয়ে ঘুমোতে গেলাম লাইট অফ করে।
এত বড় ফ্লাইট শেষে জেট ল্যাগ জেঁকে বসলো। কোনোভাবেই ঘুমোতে পারছি না। বাংলাদেশে এখন যে সন্ধ্যা! আর পাশে থেকে বাকি ৪ জন জোরে গল্প করছে। শেষমেষ আসিফের কথায় সিদ্ধান্ত নিলো সবাই ভোর ৬ টায় দিনের আলো ফোটার আগেই ওরা ম্যাকডোনাল্ডে খেতে যাবে। আর ওয়ালমার্ট থেকে বাজার করে নিয়ে আসবে।এই কনকনে ঠান্ডার মধ্যে উইন্ডব্রেকার জড়িয়ে আমরা ৬ জন বেরিয়ে পড়লাম Mission Hunger এ!
এংকোরেজে আমাদের বাসার আশেপাশে মানুষের চিহ্নমাত্র নেই। আমরা বেশ রিস্ক নিয়ে এই ভোরে বের হলাম। প্রায় ৫ কিলো হাটাহাটির পর ম্যাকডোনাল্ড চোখে পড়লো। কিন্তু সেটা বন্ধ। গুগল ম্যাপসে যেটা লিখেছিলো ওটা Drive Through এর টাইম লেখা ছিল। এখানে সকালে গাড়ি গুলো অর্ডার নেয় এই ভোরে আর শুধু ওদেরকেই অর্ডার টেক আউট দেয়।ডাইনিং এ ইন পার্সোন খাওয়া দাওয়া ৮ টার আগে করে না। আমরা এতটাই ক্ষুধার্ত ছিলাম যে ড্রাইভ থ্রু এর সামনে গিয়ে অর্ডারের প্লেসে বলতে লাগলাম কোনো ইমার্জেন্সি স্পেশাল ওয়ে তে আমাদের খাবার দেওয়া যায় কি না! কথার কোনো রেস্পন্সই করলো না।
হতাশ হয়ে আবারও হাঁটতে লাগলাম সামনের দিকে। আরেকটি হোটেলের এক লোকের সাথে দেখা হলো। ভদ্রলোক বেশ অনেক ক্ষণ তার নিজের জীবনের প্রলাপ পারলেন। আমাদেরকে একটি ছাতা উপহার দিলেন কারণ কারোর হাতে আমাদের ছাতা ছিলো না,আবার অনেকের জ্যাকেট ওয়াটারপ্রুফ ও ছিল না। আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলাম। উনি সামনে LeRoy's রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্ট করতে বললেন। হাটতে হাটতে ২-৩ কিলো পেরিয়ে রেস্টুরেন্টের দেখা পেলাম।
ওয়াল মার্ট থেকে ফেরার পথে !
এ মুহূর্তে হতাশার সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে গেলাম। এই রেস্টুরেন্টও বন্ধ! আমি অনেক হতাশ হয়ে আসিফ আশিকের উপরে রাগ ঝাড়ছিলাম কেন এত সকালে ওরা নিয়ে এসেছে। হতাশার মুহূর্ত কাটতে না কাটতেই হোটেলের মালকিন গাড়ি এসে পড়লো। উনি দেখলো সবাই বসে আছি বাইরে মাটির মধ্যে। আমাদের এই করুণ দশা দেখে উনি শুরুতেই সরি বলতে বলতে আমাদের রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকিয়ে পানি দিলেন আর খাবার অর্ডার করতে বললেন।
পশ্চিমের দেশে আরেকটা মেজর প্রব্লেম হলো খাওয়া দাওয়া। হালাল রেস্টুরেন্ট খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এখানে রেস্টুরেন্টে কোনো নন ভেজ আইটেম খেতেই পারলাম না। শেষমেষ প্যানকেক আর ডিম অমলেট দিয়ে সকালের নাস্তা সারলাম। আর ওদিকে আসিফ বেচারা এক্সাইটেড হয়ে সাথে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও অর্ডার করেছিল। এত কিছু খেতে না পেরে শেষে শেয়ার করে হেল্প করলাম ওকে শেষ করতে! রেস্টুরেন্টের ভদ্রমহিলা অস্বাভাবিক চালু। পেমেন্ট করতে গেলাম।লিট্রেলি ২-৩ সেকেন্ড এর মাঝে পেমেন্ট রিসিভ করলো। এমন সিদ্ধহস্তে ফাস্ট কাজ করতে আমি লাইফেই কাউকে দেখি নি।এটা শুধু আমি না,আমার বাকি মেট রাও বললো ওখানে খাওয়া দাওয়া শেষে। এমন স্কিল এর সত্যি সত্যিই প্রশংসা করতে হয় অনেক!
এংকোরেজের ঠিকানা
সকালের নাস্তা শেষে ওয়ালমার্টের দিকে রওনা হলাম। আমাদের মেজর প্রব্লেম হলো ট্রাভেল এডাপ্টার না আনা। আমি আগেরবার নেপাল গিয়েছিলাম, ওখানে এমন পোর্ট ইস্যু ছিল না। কিন্তু পশ্চিমের দেশে সব পোর্ট হলো ভিন্ন ধাচের।ল্যাপ্টপ বা ফোন কোনোটাই চার্জে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। এরকম অবস্থা থাকলে কালকের প্রেজেন্টেশন বা ফোনে কল মেসেজ দেওয়া সব কিছুই অসম্ভব হয়ে পড়বে!
রন্ধনশিল্পের হাতেখড়ি
ওয়ালমার্টে গিয়ে আমরা ট্রাভেল এডাপ্টার কিনে আমরা ৩ জন (আমি, রিফতি, শাহরিয়ার) বাসায় চলে আসলাম দ্রুত হেটে হেটে। পথিমধ্যে টার্ন এরাউন্ড সাইনের মাঝে কিছু র্যান্ডম ক্লিক করলাম। বাকি ইইই এর তিনজন ডিম, কলা,রুটি সহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাবার দাবার কিনে বাসায় ফিরলো দেরি করে। আমরা তিনজন বাসায় গিয়ে স্লাইডের কাজ ১ ঘন্টা করতে না করতেই ঘুমিয়ে পড়লাম।জেট ল্যাগ এর ধকল সামলাতে ভালোই প্রব্লেম হচ্ছিল।পরে ইইই এর তিনজন আবার বাসা থেকে লাবিবা নাহিয়ান দের হোটেলে গেল আবার ৬ কিলো হেটে।ওদের জন্য ওভারল আজকের দিন টা অনেক স্ট্রেস ফুল হয়ে যাচ্ছিল! বঙ্গদেশের রিকশা সমাচার বাইরের দেশে যে কী রকমের অভাব বোধ করায় তা বলার বাইরে।
আমরা আমাদের মতোন আর ওরা ওদের মতোন আগামীকালকের প্রেজেন্টেশন রেডি করছিলাম।রাত্রিবেলা আমি জীবনে প্রথমবারের মতোন কিচেনের সামনে গেলাম। দেখলাম রিফতি ডিম পোচ করছে। আমিও হাত ঘুরালাম কিছুক্ষণ। শেষে ডিম পোচ,ব্রেড আর কলা খেয়ে কয়েক দফা প্রেজেন্টেশন প্র্যাক্টিস করে ঘুমিয়ে পড়লাম পরের দিন কনফারেন্সের জন্য।










No comments:
Post a Comment