উবারে ভাড়া করা গাড়ি বেশ অনেকটা রাস্তা ঘুরিয়ে ধানমন্ডির জ্যাম ঠেলে আমার বাসার সামনে আসলো।হল থেকে শাহরিয়ার আর রিফতি কে নিয়ে রওনা হলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। অন্য গাড়িতে করে ইইই এর তিনজন ও ( আসিফ,আশিক, সুদীপ্ত) রওনা হলো।
হংকং এয়ারপোর্ট
তখন ১১ সেপ্টেম্বর রাত। শ্রমিক আন্দোলনের জন্য অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ফ্লাইটের বিশাল লাইনের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা। শেষমেষ নাহিয়ানের "স্পেশাল এরেঞ্জমেন্ট" এ বিজনেস ক্লাসের এন্ট্রি গেট দিয়ে আমরা সব এয়ারপোর্টের বোর্ডিং পাস নেওয়ার পয়েন্টে ঢুকতে পারলাম। এয়ারপোর্টে ইতোমধ্যে নাহিয়ান আর লাবিবা পৌঁছে গিয়েছিল।
ক্যাথে প্যাসিফিক এর এয়ারবাস দিয়ে প্রথম ট্রানজিট হংকং এ। রাত্রিবেলা প্লেন জার্নির এক্সপেরিয়েন্স আমার এই প্রথম। জানালার পাশে সীট না পড়ায় দুর্ভাগ্যক্রমে আর রাতের আকাশ দেখা হয়নি প্রথম যাত্রায়। এয়ারপোর্টে ঢুকার সময় ফাইনাল সিক্যুরিটি চেকিং এর সময় আমাকে একজন ভদ্রমহিলা অনেক ক্ষণ ডিটেইলস জিজ্ঞেস করছে। আমাকে তারপরে কিছুক্ষণ জিজ্ঞেস করার পরে বলছেন আমি উনাকে চিনতে পারছি কি না।আমি তখনও হতবিহবল। উনি বললো উনি সাকিবের আম্মু। অনেএএক দিন পরে আন্টির সাথে দেখা হওয়ায় অনেক খুশি লাগলো।
ম্যানহাটান সী বিচ লাইট হাউজ
হংকং এর ফ্লাইট প্রায় চার ঘন্টার। তারপরে হংকং এ ট্রানজিট ৫ ঘন্টার।হংকং এ ল্যান্ড করে এয়ারপোর্ট এ এসে পুরো হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। কল্পনাতীতভাবে টেকনোলজিকালি এডভান্সড আর অদ্ভুত রকমের সুন্দর। এয়ারপোর্টের কানেক্টিং ফ্লাইটের লাউঞ্জ এর সামনে ব্ল্যাক হোয়াইট চেসবোর্ড রাখা। এয়ারপোর্টের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়ার জন্য ট্রাভেলেটর।দেখতে ফ্ল্যাট সিঁড়ি,কিন্তু চলমান। এটা হয়তো বাইরের দেশে কমন।কিন্তু আমার চোখে প্রথম পড়লো। সময় বাঁচানোর এই অভিনব পন্থা দেখে বিস্মিত হলাম। এয়ারপোর্টের ফ্লোরে দোকান গুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। অটোমেটেড রোবোটিক হ্যান্ড দিয়ে জিনিসপত্র দেওয়া নেওয়া করছে অনেক জায়গায়। আবার কিছু খাবার খেতে চাচ্ছিলাম।দেখলাম কোনোটাই বাংলাদেশি টাকায় ৫০০ টাকার কমে নাই। তাই নবাবি ভোজনের চিন্তা বাদ দিয়ে লাউঞ্জ এ স্লাইড বানাতে বসে গেলাম!
হংকং থেকে পরের গন্তব্য লস এঞ্জলেস।বলতে গেলে পৃথিবীর পুরোপুরি অপর প্রান্ত। মঝে শুধুই প্রশান্ত মহাসাগর। আগে বিদেশ বলতে শুধু নেপাল যাওয়া হয়েছে,তাও মাত্র ১ ঘন্টার ফ্লাইট।এত বিশাল ফ্লাইটের অভিজ্ঞতা কেমন হবে ভাবতে ভাবতে সবাই লস এঞ্জেলেস অভিমুখী ক্যাথে প্যসিফিকের ইকোনমি ক্লাসে উঠে বসলাম।হংকং এর অন বোর্ডিং এর চেকিং পুরোপুরি অটোমেটেড।ঢোকার সময় জাস্ট ফেসিয়াল রিকগ্নিশন দিয়েই সীট নাম্বার বলে দেয়। কোনো পাসপোর্ট বা বোর্ডিং কিছুই বের করা লাগে না।
ক্যাথে প্যসিফিকের এয়ারবাস গুলো অনেক আলিশান ঘরানার হলেও টেম্পারেচার হিউমিডিটি কন্ট্রোল ভালো মনে হলো না। পুরো সময় জুড়েই চাদর মুড়ে থাকতে হয়েছে লং ফ্লাইটে। এন্টারটেইনমেন্টের ব্যবস্থা আছে। বেশ কিছু মুভি, এলবাম প্লেলিস্ট আপ্লোড করা আছে।আমি থ্রিলারপ্রেমী মানুষ।থ্রিলারের কালেকশন না পেয়ে স্যাড হয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। কী করবো ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম টের পেলাম না।
ঘুম ভাঙলো আচমকা ঝাঁকুনির আওয়াজে।বেশ বাজেভাবে প্লেন হেলছে ক্রমাগত ডানে বামে।বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। পাইলট কিছুক্ষণের মাঝে এনাউন্স করলো প্যাসিফিকে ব্যাড ওয়েদার চলছে। তাই এয়ার টারব্যুলেন্স এর কবলে পড়েছে প্লেন সাময়িক ভাবে। সবাইকে শান্ত থাকার জন্য বললো।আশ্বস্ত হলাম তখন।
ক্যাথে প্যাসিফিকে মুসলিম মিল হিসেবে লাঞ্চ আর ডিনার দিয়েছিলো। অস্বাভাবিক রকমের বিস্বাদ। আমাদের বাঙালিদের মসলা খাওয়ার অভ্যাস। অর্ধসিদ্ধ জিনিস পত্র খেয়ে কারোর ই স্বাদ মিটে না। দুইবার খাওয়ার টাইমে বিফ আর চিকেনের পাশাপাশি সেদ্ধ চিংড়ি আর সবজি দিয়েছিল। সাথে মার্জারিন আর ব্রেড।মোটামুটি সব গুলা কোনোমতে হজম করতে পারলেও কাঁচা টক সবজি কোনোমতেই পুরোটা হালাল করতে পারলাম না!
যাই হোক, ঘুম ভাঙার পরেই দেখছিলাম আশপাশে পুরোই অন্ধকার আর আমার সামনে পিছে সবাই ঘুমোচ্ছে।আমি প্লেনের সিটের সামনে ডিসপ্লে তে ভালো মুভি খুঁজে দেখছিলাম। পরে "A Bug's Life" এনিমেশন মুভি টা পেলাম।একদম ছোটবেলা, বলতে গেলে ক্লাস ওয়ান বা টু,সেসময় মুভিটির বাংলা ডাবিং দেখেছিলাম। আবারও এই বুড়া বয়সে মূল এনিমেটেড মুভি টা দেখলাম সব টা বিমানের মধ্যে।
মুভি দেখা শেষে আবার ঘুমোলাম।ঘুম শেষে প্রায় ১৫ ঘন্টা পর সামনের স্ক্রিনের ফ্লাইট ট্র্যাকারে দেখতে পেলাম লস এঞ্জেলেসের দিকে প্রায় বিমান এসে পড়েছে। প্লেনের সীটের সামনের স্ক্রিনে এই জিপিএস ট্র্যাকার আর প্লেন ক্যামেরা অনেক relaxing. ক্যামেরা দিয়ে বিমানের সামনের চাকার ল্যান্ডিং আর নিচের ভিউ মোটামুটি সব টা দেখা যায়। আর থ্রিডি ট্র্যাকারে লাইভ লোকেশন দেখতে পারা যায়।
প্লেন কিছুক্ষণের মাঝে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলস এ ল্যান্ড করলো। এই প্রথম মার্কিন মুলুকে পা দেওয়া। হুট করেই পরিবেশ এর ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন। হংকং অবধি এশিয়ান দের চেহারা দেখতে দেখতে এখন পুরোপুরি সাদা চামড়ার আমেরিকান দের দুনিয়ায়। শুনেছিলাম,ইউ এস এ তে খুব কড়া টাইপের ইমিগ্রেশন হয়। আমাকে ইমিগ্রেশন অফিসার আসার কারণ আর হোটেল বুকিং জানতে চেয়ে পাসপোর্টে সীল দিয়ে দিল। বেশ স্মুথভাবেই ইমিগ্রেশন ক্রস করে LAX এয়ারপোর্ট দিয়ে এক্সিট করে গেলাম আমি,শাহরিয়ার আর আশিক।আর সাথে যাত্রা পথের প্রথম ঝামেলার সূত্রপাত করলাম।
LAX থেকে আলাস্কার কানেক্টিং ফ্লাইটে যেতে হলে অন্য একটা টার্মিনালে গিয়ে আগে লাগেজ কন্টেইনারে দিয়ে আসা লাগে।আমরা সেটা না করে ডিরেক্ট ডিপার্চার গেট দিয়ে বের হয়ে গিয়েছি। রিফতিকে কল দেওয়ার পর ও ঘটনা বললো। আমরা এদিকে মনের আনন্দে "Welcome to Los Angeles" লেখার সামনে ফটোসেশন করছি। তো এমন নিউজ পেয়ে আমরা হন্তদন্ত হয়ে আলাস্কা এয়ারলাইন্সের টার্মিনালের দিকে দৌড় লাগালাম।আমাদেরকে একজন ভদ্রমহিলা পুরো রাস্তা জুড়ে হেল্প করলো।উনার প্রতি কৃতজ্ঞতা।
সবশেষে টার্মিনাল ৬ এ আলাস্কা এয়ারলাইন্স এ ব্যাগ ট্যাগ সহ আমাদের ২ জনের লাগেজ বোর্ডিং করতে পারলাম। এরপরে কয়েক দফা মিলিয়ে প্রায় ২.৫ ঘন্টা সিস্টেম লস করে আমরা ম্যান হাটান বীচের দিকে রওনা হলাম। রাস্তায় ক্যাব বা উবার কোনো কিছুই ৮ জনের জন্য ম্যানেজ করা যাচ্ছিলো না। অনেক ঘাটাঘাটি শেষে অনেক দূরে গিয়ে একজন চালকের সন্ধান পেলাম যিনি উনার ক্যাবে ৮ জন নিতে পারবেন। বাকি সব ড্রাইভার ৫ জনের উপরে নিতে চাইনি কোনোভাবেই,এটা আমেরিকার অপরাধের শামিল তাই।
যার ক্যাবে উঠলাম উনি আর্মেনিয়া বংশোদ্ভূত।আগে রিফিউজি হিসেবে এসেছিলেন,এখন ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থায়ী বাসিন্দা। উনি বেশ ভালো ব্যবহার করলেন পুরোটা টাইম।উনার হোয়াটস অ্যাপ নাম্বার রেখে দিলাম ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য।আমেরিকায় গিয়ে এই সিম না থাকার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে। আমেরিকায় সিম কার্ডের দাম প্রচুর (প্রায় ১৯০ ইউ এস ডি)।তাও মাত্র ১ মাস এক্টিভেট থাকবে। নেক্সট এ কখনও আসলে আর ইউজ করা যাবে না। ভাগ্য ভালো যে রিফতির ফোনে আমরা ৩ জন মিলে শেয়ারে রোমিং ডেটা কিনে নিয়েছিলাম। তাই মোটামুটি পুরো টাইম জুড়ে নেটওয়ার্কের বাইরে একদম যাওয়া লাগে নি। কিন্তু স্টিল রোমিং কল না কেনায় ইউএস এর কোনো নম্বরে কল দেওয়া যায়নি। হোয়াটস অ্যাপ এ কাজ করা লেগেছে ইনার্জেন্সি কেসেও।
বীচের সামনে আমরা ৮ জন নেমে গেলাম। ৬০ ডলার নিলো ইন টোটাল। এই টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে আমরা চললাম ম্যানহ্যাটান সী বিচের দিকে। তখন দুপুর বেলা। সূর্য একদমই মাথার উপরে। এরপরেও তেমন গরম বোধ হচ্ছে না। মানুষজন সবাই রোদ পোহাচ্ছে,ভলিবল খেলছে।প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে লাগানো এই সী বিচ।পাশে সাইকেলের আলাদা লেন। যে যার মতোন সাইকেল চালাচ্ছে,বাকি কাজ করছে। বীচের মাঝ বরাবর একটা লাইট হাউস। লাইট হাউসে আর সমুদ্রের পাশে আমরা সবাই সিংগেল আর গ্রুপ ফটো তুললাম।
বেশ অনেক ক্ষণ সী বিচে কাটানোর পরে সবারই পানি তৃষ্ণা পেল। এখানে পানির কল কোনটা বুঝতে পারছিলাম না। মোটামুটি সব কিছুই পাশ্চাত্যের দেশে উলটা। পানি খাওয়ার ট্যাপ টা এংগেল করে সেটাপ করা। আমি বুঝছিলাম না,পরে একজন দায়িত্বরত ভদ্রলোক আমাকে দেখিয়ে দিলেন কীভাবে ইউজ করতে হয়। এখানে পানি ফোয়ারার মতোন উপরে উঠে,ওখানে হা করে খেতে হয়! এভাবে হালকা পানি খাওয়ার পর আমি পাশের শপে গেলাম মিনারেল ওয়াটার কিনতে। ২৫০ মিলি পানির বোতলের দাম ৩ ইউ এস ডি,বেসিকালি বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪০০ টাকা! এই দাম ওদের দেশের রেস্পক্টে অনেক কম,কিন্তু তাও আমাদের এই প্রথম দফা ভিজিটে দাম শুনে কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে ইতস্তত করছিলান কিনবো কি না। আমার এই অবস্থা দেখে পাশে একজন আমেরিকান ভদ্রমহিলা জোর করে আমার হয়ে পে করে দিলো।আমি বারবার না করলাম তাও শুনলো না। বিব্রতকর এক পরিস্থিতি তৈরি হলো,সাথে এখানের মানুষের প্রতি একটা ভালো অনুভূতিও কাজ করলো।
তারপরে পড়ন্ত বিকালের দিকে আমরা আবার সেই আরমেনিয়ান ড্রাইভারকে ফোন দিয়ে আমাদের স্পটে নিয়ে আসলাম। উনি এবার ৬৫ ইউ এস ডি দিয়ে আমাদের কে টার্মিনাল ৬ এ নিয়ে গেল। উনি না থাকলে আসলেই এই জায়গায় ক্যাব বা উবার নিয়ে অনেক সমস্যা হতো আমাদের। এক হলো ৮ জন একসাথে বসা নিয়ে সমস্যা। অন্য দিকে দাম নিয়ে নেগোশিয়েশন।উনার দেখা পাওয়া পুরো ব্লেসিং ছিল আমাদের জন্য।
আলাস্কা এয়ারলাইন্সে সিক্যুরিটি চেকিংবেশ স্ট্রিক্ট।পকেটে রাখা টিশ্যু অবধিও চেক করে। চেকিং শেষে আমরা বোর্ডিং গেটের দিকে ওয়েট করতে লাগলাম। LA থেকে আলাস্কায় আমাদের ফ্লাইট বোয়িং এর। এখানে সামনে আর কোনো এন্টারটেইনমেন্ট ডিসপ্লে বা অন্য কিছু ছিলো না। খাবার দাবার হিসেবে নরমাল বিস্কুট আর ছোটখাটো হট ড্রিংক্স। এগুলা খেয়ে প্রায় পুরোটা সময়ই আলাস্কা এয়ারলাইন্সে ঘুমিয়েছি। হঠাৎ শাহরিয়ার বললো অরোরা দেখা যাচ্ছে প্লেন থেকে। আমার বিপরীত পাশে ছিলো ও। ও ভিডিও করলো অরোরা।এটা সম্ভবত এক্সট্রিমলি লাকি না হলে পসিবল হতো না। আলাস্কায় ল্যান্ড করার আগেই নর্দার্ন লাইটের দেখা পেলাম!
তখন আলাস্কার টাইম জোনে ১৩ সেপ্টেম্বর ভোর রাত( রাত ১ টার মতোন)। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে টানা। এর মাঝে কনকনে ঠান্ডায় আমরা আলাস্কা ল্যান্ড করলাম। এয়ারলাইন্স থেকে ব্যাগেজ চেক আউট করে ক্যাব খুঁজতে লাগলাম। শেষমেষ কোনোভাবেই ৬ জনের ক্যাব না পেয়ে( নাহিয়ান আর লাবিবা আলাদা ক্যাবে করে ওদের হোটেল Wildbirch এ চলে গিয়েছিল) আমি আমাদের বুক করা হোটেলের মালিক Crystal কে কল করলাম। উনি উনার এন্ড থেকে পেমেন্ট করে উবার কল করে দিলো। ইউ এস এ তে উবার কল করতে গেলে US এর ব্যাংক কার্ড লাগে। আমাদের মাল্টি কারেন্সি কার্ড দিয়ে কারোরই পেমেন্ট করা যাচ্ছিলো না। যাই হোক সবশেষে ত্রিদেশীয় সফরের ( হংকং, ক্যালিফোর্নিয়া আর আলাস্কা) শেষ গন্তব্যে আমরা পৌঁছালাম।কয়েকদিনের জন্য আমাদের নতুন ঠিকানা 2900 W Northern Lights Blvd,Anchorage,Alaska














No comments:
Post a Comment